স্থিতপ্রজ্ঞ বিষয়ে অর্জুনের প্রশ্নের তৃতীয় অংশ `কিমাসীত’ বা কীভাবে অবস্থান করেন এ বিষয়ে ৫৮ নম্বর শ্লোক থেকে জেনে আসছি। শেষ কথাগুলো ৬২ ও ৬৩ শ্লোক নম্বরে জানাচ্ছেন। ‘মৎপরঃ’- মন ভগবানের শরণাগত, শরণাগত না হলে বিষয় চিন্তায় নিমগ্ন হবেই। বিষয়ের কথা ভাবতে ভাবতে কীভাবে সে বিষয়ে আসক্ত হয়, পরিণতি কী হয় সে বিষয়ে গীতাশাস্ত্র ৭টি সিঁড়ির নামকরণ করেছেন। যথা : ১. বিষয়চিন্তা, ২. সঙ্গ, ৩. কাম, ৪. ক্রোধ, ৫. সম্মোহ, ৬. স্মৃতিবিভ্রম এবং ৭. বুদ্ধিনাশ বা অধঃপতন।
ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের মন তাতে সঙ্গ বা আসক্তি জন্মায়। যেমন : আমরা একটি দোকানে গেলাম, সেখানে একটি জিনিস দেখে কিনলাম না, কিন্তু খুবপছন্দ হলো। এটিই আসক্তি বা ‘ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ।’ কিছুদিন পর আবার সেটি (পছন্দ হওয়া জিনিসটি) দেখলাম, তখন সেটি পাওয়ার ইচ্ছা জাগবে, মানে- ‘সঙ্গস্তেষুপজায়তে।’
যাদের মন বশীভূত নয় এবং পরমাত্মার চিন্তা করে না; বিষয় ভোগে সুখ ও সুখবুদ্ধি থাকে, তাদের মনে ইন্দ্রিয়াদির বিষয়-চিন্তা বেশি হয়। বিষয় চিন্তা করতে করতে তখন ভোগের ইচ্ছা জাগ্রত হয়, এটাই হলো- আসক্তি। আসক্তি থেকে কামনার এবং কামনায় কোন বাধা প্রাপ্ত হলে দ্বেষবুদ্ধিতে
তখন ক্রোধ উৎপন্ন হয়। যা তাদের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। যেমন : এক ব্যক্তি প্রত্যেহ পত্রিকা হাতে নিয়েই গাড়ির বিজ্ঞাপন পড়েন। পড়তে পড়তে তার মনে গাড়িতে চড়তে বা সঙ্গ লাভে সুখ অনুভব আসে। গাড়ি চড়ার পর, গাড়ি ক্রয়ের কামনা আসবে। তখন পরিবারের অন্য কেউ যদি গাড়ি ক্রয়ে বাধা দেয়, সে সময় মনে রাগ বা ক্রোধ জন্মাবে- এ কথাই শ্লোক নম্বর ৬২তে বলা হয়েছে। এ ক্রোধের ফলে কী হয় তা পরের শ্লোকে জানাচ্ছেন :
‘ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ’ এখানে ‘সম্মোহ’ মানে হলো- বিচার করার ক্ষমতা না থাকা। একটি জিনিস স্বরূপত যা আছে তা না দেখে, অন্য কিছু দেখা। যেমন : রাতের অন্ধকারে আপনি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। তখন দূর থেকে একটি গাছ দেখেলেও মনে হবে যে, যার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে তিনি হয়ত আসছেন। কারণ তখন তো তার মন মোহগ্রস্থ হয়ে থাকে। এমন ভাবটিই হলো- সম্মোহ। তেমনি মানুষের হৃদয়ে যখন ক্রোধ জাগ্রত হয়, অগ্নিশর্মা হয়ে যায় তখন তার মাঝে বিবেক শক্তি থাকে না। সে সময় সামনে-পিছনের কথা ভাবে না, পরিণামে দিকে কোন খেয়াল থাকে না। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ক্রোধযুক্ত হয়ে কাজ করে, এটাই ‘‘ক্রোধাদ্ভবতি
সম্মোহঃ’ উৎপন্ন হওয়া।
‘সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।’
ক্রোধের কারণে মানুষের মূঢ়ভাব বৃদ্ধি পায়। তখন স্মৃতিশক্তি
মাথায় থাকে না। কেউবা বলতে পারেন- স্মৃতিশক্তি কী? পূর্বের কোন বিষয় বা ঘটনা বর্তমানে নিয়ে আসার ক্ষমতাই হলো স্মৃতি। যখন আমাদের ‘সম্মোহ’ হয় তখন স্মৃতি থাকে না। কী সম্পর্ক, কী করা উচিৎ, কী করা উচিৎ নয়, চিন্তা-ভাবনা তখন এলোমেলু হয়ে যায়। তখন তিনি যা খুশি করতে পারেন। ডাক্তার যদি স্মৃতি ভুলে যান যে তিনি ডাক্তার, তখন ডাক্তারী হবে না, সর্বনাশ হবে। এ ভাবই হচ্ছে -সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
‘স্মৃতিভ্রংশাদ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি।।’
বুদ্ধির বিভ্রম হলে কর্তব্য-অকর্তব্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি থাকে না-যাকে বলা হয় ‘স্মৃতিভ্রংশাদ বুদ্ধিনাশ।’ এই বুদ্ধির নাশ হলে কী হয়- ‘বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি’ মানে অধপতিত হয়। মৃত্যুর পর নানান নীচ যোনীতে জন্ম হয় বা নরকে গমন করে। এভাবেই বুদ্ধিনাশ দ্বারা নিজের স্থিতি থেকে পতন হয়ে থাকে।
